কলকাতা: কলকাতার শারদ উৎসবে যেমন একদিকে থাকে বারোয়ারি পূজাগুলো নিয়ে তুমুল আকর্ষণ অন্যদিকে কলকাতার বিখ্যাত বাড়ির পূজাগুলোও থাকে উৎসাহের কেন্দ্রবিন্দুতে।
বারোয়ারি পূজার মূল আকর্ষণ যেমন তার ব্যাপকতা, থিমের বৈচিত্র্য আর আলোর ঝরনাধারায় প্রাণখোলা উৎসবের সুর তেমনি বাড়ির পূজাগুলোতে থাকে সনাতন ধর্মের বিভিন্ন ধারার পূজা পদ্ধতির সমাহার।

কলকাতার বাড়ির পূজাগুলোর বাড়তি পাওনা বাড়িগুলোর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা ইতিহাস। সে ছাতুবাবু, লাটুবাবুর বাড়ির নাটমন্দির হোক বা মল্লিক বাড়ির দালানের বিটার ভেনাস মূর্তি কিংবা রানী রাসমনির বাড়ির পূজামণ্ডপ, যেখানে কবিগানের লড়াইয়ে সুর বেঁধেছেন ভোলা ময়রা থেকে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি।
কলকাতার বাড়ির পূজাগুলোর কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে রাজা নবকৃষ্ণের শুরু করা শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজা। এ পূজায় নিমন্ত্রিত থাকতেন লর্ড ক্লাইভ, ওয়ারেন হেস্টিংসের মতো ব্রিটিশ প্রশাসকরা। ১৭৫৭ সালে এ পূজা শুরু হয়। তবে ১৭৯০ সালে স্থান পরিবর্তন করে পূজাটি বর্তমানে ৩৬-এ নবকৃষ্ণ স্ট্রিটে চলে আসে। সেই থেকেই এ বাড়িতে চলছে পূজা।
শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজার অতীতে রয়েছে কবিগানের আসর। সারা রাত ধরে গান গাইতেন অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, হরিঠাকুর, ভোলা ময়রার মতো কবিয়ালরা। পূজার শেষে থাকতো যাত্রাপালার আয়োজন। আজও পূজার আয়োজন করা হয় রাজবাড়ির পুরনো দালানে।
এরপরেই বলতে হয় রানী রাসমণির বাড়ির পূজার কথা। এ পূজায় পশুবলির চল ছিল। ১৯০৩ সাল থেকে পশুবলির প্রথা বন্ধ করে দিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। রানীর বাড়ির সবচেয়ে বড় আকর্ষণের বিষয়টি হলো সিঁদুর খেলা। এছাড়াও এখানকার কুমারী পূজা বিখ্যাত। প্রিন্স দ্বারকানাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও প্রতি বছর এ পূজায় আসতেন। প্রচলিত আছে, শ্রী রামকৃষ্ণ একবার সখীর ছদ্মবেশে একবার পূজা দেখতে এসেছিলেন।

এরপরেই আসে ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়ির পূজার কথা। এ বাড়ি পূজার কথা বলার আগে অবশ্যই কলকাতার এই দুই ‘বাবু’র কথা বলা দরকার। এই দুই ‘বাবু’ কলকাতা ‘বাবু কালচার’- এর এক অনন্য নিদর্শন। ছাতুবাবুর আসল নাম আশুতোষ আর লাটুবাবুর আসল নাম প্রমথনাথ। তাদের ছিল এক অদ্ভুত শখ, বুলবুলির লড়াই। শোনা যায়, ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রশিক্ষক এনে বুলবুলিদের লড়াই শেখাতেন এই বাবুরা। এর জন্য অর্থ খরচের কোনো সীমা ছিল না।
ছাতুবাবু-লাটুবাবুর পূর্বপুরুষ বাবু রামদুলাল দে এ পূজার প্রতিষ্ঠা করেন। এ পূজার বিশেষত্ব হচ্ছে, দশদিন ধরে পূজা চলে। প্রতিমায়ও আছে এক বিশেষ ধারা। এ বাড়ির দেবীর বাহন সিংহের দেহে আছে ঘোড়ার মুখ। প্রতিমার পেছনের চালচিত্রটিও অন্য ধরনের। এখানে জয়া, বিজয়া ও শিব ছাড়াও থাকেন রাম এবং হনুমান। দশমীর দিন নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর চল আছে এ বাড়িতে।
হাটখোলার দত্ত বাড়ির পূজায় ১৫ দিন ধরে চলে দেবীর বোধন। এখানেও আছে নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর চল। আরও একটি বিশেষত্ব আছে সাবেকি এ বাড়ির পূজায়। এখানে ক্ষীরের পুতুল দেওয়া হয় পূজার প্রসাদ হিসেবে।
অন্যতম বিখ্যাত মল্লিক বাড়ির পূজার শুরু ১৯২৫ সালে। অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক বর্তমানে এ পূজার পরিচালনা করেন। পূজা উপলক্ষে ভবানীপুরের বাড়িতে সমস্ত আত্মীয়রা জড়ো হন। অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক প্রতি বছরই এ পূজায় উপস্থিত থেকে সমস্ত কাজে অংশগ্রহণ করেন।
উত্তর কলকাতার মিত্র বাড়ির পূজায় এসেছিলেম মহাত্মা গান্ধী। ১৮০৭ সালে রাধাকৃষ্ণ মিত্র এ পূজার প্রচলন করেন। গান্ধীজী ছাড়াও এ পূজায় এসেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত, জহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী, রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ, সরোজিনী নাইডু, মওলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ।

সার্বন রায়চৌধুরীদের পূজা কলকাতার প্রাচীনতম বাড়ির পূজা। ১৬১০ সালে কলকাতায় মাটির দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে প্রথম দুর্গাপূজার প্রচলন হয় এ পরিবারে। কলকাতার বড়িশা অঞ্চলে তাদের পারিবারিক আটচালায় এ পূজা হয়। রাজা মানসিংহের কাছ থেকে জমিদারি পাওয়ার পর থেকেই গাঙ্গুলি পরিবার বড়িশা অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেন। উপাধি পান ‘রায়চৌধুরী’।
জোব চার্নক সাবর্ণ রায়চৌধুরীর কাছ থেকেই তিনটি গ্রাম কিনে নেন। এগুলো ছিল কলকাতা, গোবিন্দপুর ও সুতানটি, প্রতিষ্ঠা হয় আজকের কলকাতা শহরের।
দুর্গাপূজার আটচালায় বসেই তিনটি গ্রাম বিক্রির দলিলটি লেখা হয়েছিল।
এছাড়াও কলকাতায় বেশ কিছু বিখ্যাত বাড়ির পূজা আছে। এগুলোর সবক’টিই আধুনিক কলকাতার ‘থিম’ পূজার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ধরে রেখেছে তাদের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যকে।
বাংলাদেশ সময়: ১৩০৫ ঘণ্টা, অক্টোবর ১৩, ২০১৫
ভিএস/ এএসআর